ভারতে উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ও বিতর্ক

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ও বিতর্ক

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়া ‘ভারতের স্বাধীনতা আইন’ অনুসারে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই আগস্ট অবিভক্ত ভারত দ্বিখণ্ডিত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে এবং ভারত ও পাকিস্তান নাম দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় । সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পশ্চিম পাঞ্জাব, পূর্ব বাংলা ও আসামের শ্রীহট্ট জেলার কিছু অংশ নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র ও অবশিষ্ট ভূখণ্ড নিয়ে ভারতরাষ্ট্র গঠিত হয় । দেশভাগের পর নবগঠিত স্বাধীন ভারতরাষ্ট্রকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় । এই সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম হল ভারতের উদ্বাস্তু সমস্যা

দেশভাগের পর মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পৃথক পাকিস্তানের সৃষ্টি হলে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পশ্চিম পাঞ্জাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অত্যাচারে সেখানকার হিন্দু, শিখ প্রভৃতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিরাপত্তা – হীনতার সম্মুখীন হয় ও সর্বহারা হয়ে দলে দলে ভারতের অন্তগত পূর্ব পাঞ্জাবে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নেয় । অপরদিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত পূর্ব পাঞ্জাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ও শিখদের অত্যাচারে দলে দলে মুসলমানরা পশ্চিম পাঞ্জাবে চলে যায় । পাকিস্তান থেকে বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, পাঞ্জাব -সহ বিভিন্ন রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে । পাকিস্তান ও ভারতে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে । পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান ত্যাগের সময় প্রচুর হিন্দু, শিখ ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ দাঙ্গায় নিহত হন । একই ভাবে ভারতে এবং ভারত ত্যাগের সময় বহু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ দাঙ্গায় নিহত হন । এছাড়া লুন্ঠন, বাড়িতে আগুন লাগানো, মাঠের ফসল নষ্ট প্রভৃতি অবাধে চলে । উভয় দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু নারী নির্যাতনের শিকার হয় । ধর্ষণ, অপহরণ প্রভৃতি ঘটনা অবাধে চলে ।

দাঙ্গা বন্ধ করার জন্য ভারত সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নেয় । দিল্লির রাস্তায় সেনা নামানো হয় । গান্ধিজি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিবাদে অনশন শুরু করেন । গান্ধিজির প্রচেষ্টায় দাঙ্গা থেমে যায়, দাঙ্গার পরিণতি হিসাবে নাথুরাম গডসের হাতে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধিজিকে প্রাণ হারাতে হয় । গান্ধি হত্যার পরেও ভারতে উদ্বাস্তুদের আগমন অব্যাহত থাকে । উদ্বাস্তু স্রোত প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ উদ্যোগী হয় । ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলি খাঁ -র মধ্যে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল ‘দিল্লি চুক্তি’ বা ‘নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয় । চুক্তি অনুযায়ী ঠিক হয়— সংখ্যালঘু শ্রেণি নিজ রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে এবং নিজের রাষ্ট্রের কাছে যে-কোনো সমস্যার প্রতিকার চাইবে । পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে কেউ অন্য দেশে শরণার্থী হতে চাইলে সে সাহায্য পাবে । ভারত ও পাকিস্তান উদ্বাস্তু সমস্যার কারণ ও সংখ্যা নির্ধারণের জন্য অনুসন্ধান কমিটি ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করবে । পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভায় সংখ্যালঘু প্রতিনিধি থাকবে । এই চুক্তিতে ভারতীয় মন্ত্রিসভার অনেকেই সন্তুষ্ট হতে পারেন নি । উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে এই চুক্তি যথেষ্ট নয় মনে করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও ডঃ ক্ষিতিশ চন্দ্র নিয়োগী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন ।

‘নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি’ বা ‘দিল্লি চুক্তি’ উদ্বাস্তু সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারেনি । শরণার্থী আগমনের সংখ্যা কিছুটা কমলেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শরণার্থীরা ভারতে আসতে থাকে । প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে স্বাধীনতার পর প্রথম পাঁচ বছরে উদ্বাস্তুদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ওপর জোর দেন । তাই ভারতের ইতিহাসে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরবর্তী পাঁচ বছর ‘পূনর্বাসনের যুগ’ নামে অভিহিত হয় । ভাষাগত সমস্যা না থাকায় পশ্চিম পাঞ্জাবের পাঞ্জাবি ও সিন্ধি উদ্বাস্তুরা দিল্লি, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশে নির্দ্বিধায় আশ্রয় নিয়ে সেখানে তারা নিজেদের বাসস্থান গড়ে তোলে । কিন্তু বাংলাবাসী উদ্বাস্তুরা ভাষাগত সমস্যা ও অন্যান্য কারণে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় । ফলে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতি যথেষ্ট প্রভাবিত হয় ।

One thought on “ভারতে উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ও বিতর্ক”

Comments are closed.