ক্ষয়চক্র : গঠন ও প্রক্রিয়া ➤ তৃতীয় পর্ব

উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল : ক্ষয়চক্র : গঠন ও প্রক্রিয়া

আলোচ্য বিষয় :
ক্ষয়চক্রের ব্যাঘাত বা প্রতিবন্ধকতার কারণ
পুনর্যৌবন লাভ
পুনর্যৌবন লাভের ফলে গঠিত ভূমিরূপ |

ক্ষয়চক্রের ব্যাঘাত বা প্রতিবন্ধকতার কারণ :
সমুদ্রপৃষ্ঠের পতন হলে অথবা অন্য কোনাে প্রাকৃতিক কারণে নদীর ক্ষয় করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে নদী তখন পুরােনাে ভূমিভাগের ওপর নতুন উদ্যমে নিম্নক্ষয় শুরু করে। এর ফলে পর্যায়িত বা সমপ্রায় ভূমিরূপের ওপর যৌবনচিত ভূমিরূপ অধ্যারােপিত হয়। একে ভূমিরূপের পুনর্যৌবন লাভ বলে। প্রকৃতিগত পার্থক্য অনুযায়ী ভূমিরূপের পুনর্যৌবনলাভকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়-

[1] গতিময় পুনর্যৌবন লাভ,

[2] ইউস্ট্যাটিক পুনর্যৌবন লাভ ও

[3] স্থিতিশীল পুনর্যৌবন লাভ।


[1] গতিময় পুনর্যৌবন লাভ : মহীভাবক আলােড়ন অথবা গিরিজনি আলােড়নের কারণে সংলগ্ন অঞ্চলে ভূমিভাগের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে নদীর গতিপথের ঢাল বেড়ে যায়। নদীর ঢাল বেড়ে গেলে নদীখাতে জলপ্রবাহের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায় এবং নদী নতুন উদ্যমে নিম্নক্ষয় শুরু করে। ফলে, পূর্ববর্তী ভূমিরূপের ওপর যৌবনােচিত ভূমিরূপ অধ্যারােপিত হয়। এইভাবে পুনরুত্থিত ভূমিভাগ পুনর্যৌবন লাভ করে। একে গতিময় পুনর্যৌবন লাভ বলে। ভূমিভাগ সমুদ্রের দিকে হেলে উথিত হলে সমুদ্র অভিমুখে নদীর গতিপথ বরাবর তৎক্ষণাৎ নদীর নিম্নক্ষয় শুরু হয়। ভূমিভাগ যেদিকে হেলে উথিত হয়, নদীর গতিপথ তার আড়াআড়ি বিস্তৃত হলে, ভূমিভাগের উত্থানের প্রভাব তৎক্ষণাৎ লক্ষ করা যায় না। কারণ আড়াআড়ি অবস্থায় নদীর নিম্নক্ষয় অতি ধীর গতিতে হয়।

[2] ইউস্ট্যাটিক পুনর্যৌবন লাভ : পৃথিবীব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের অবনমন ঘটলে ভূমিরূপের ইউস্ট্যাটিক পুনর্যৌবন লাভ ঘটে। প্রধানত দুটি কারণে ভূমিরূপের এই রূপ পরিবর্তন হয়, যথা-

ভূ-আলােড়ন : ভূ-আলােড়নের ফলে সমুদ্রবক্ষ অবনমিত হলে অথবা সমুদ্রবক্ষ বিস্তৃত হলে সমুদ্রের জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ নীচে নেমে যায়। ভূমিরূপের আপেক্ষিক উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে নদীর নিম্নক্ষয় করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং ভূমিভাগ পুনর্যৌবন লাভ করে। একে ভূবিপর্যয়জনিত পুনর্যৌবন লাভ বলে।

হিমযুগের প্রভাব : হিমযুগে সমুদ্রের জল বাষ্পীভূত হওয়ার পর ঘনীভূত হয়ে তুষার রূপে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে সঞ্চিত হলে সমুদ্রের জলের পরিমাণ কমতে থাকে। নদীর মাধ্যমে যে পরিমাণ জল সমুদ্রে ফিরে আসে তা সমুদ্রের বাষ্পীভূত জলের পরিমাণের থেকে কম। তাই, হিমযুগে। সমুদ্রপৃষ্ঠের অবনমন ঘটে। ভূমির আপেক্ষিক উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায়, নদীর নিম্নক্ষয়ের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে, ভূমিরূপের পুনর্যৌবন লাভ ঘটে। একে হৈমিক ইউস্ট্যাটিক পুনর্যৌবন লাভ বলে।


[3] স্থিতিশীল পুনর্যৌবন লাভ : সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান ও অবনমন ছাড়াই নদীর নিম্নক্ষয় করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে ভূমিভাগ পুনর্যৌবন লাভ করে। একে স্থিতিশীল পুনর্যৌবন লাভ বলে। প্রধানত তিনটি কারণে ভূমিভাগের পুনর্যৌবন লাভ হয়।

নদী গ্রাস : কোনাে শক্তিশালী নদী মস্তক ক্ষয়ের মাধ্যমে অন্য কোনাে নদীকে গ্রাস করলে ওই নদীর জল শক্তিশালী নদীতে এসে পড়ে। ফলে নদীর জলপ্রবাহের মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যায়। ফলে নদী পূর্বাপেক্ষা শক্তিশালী হয়ে নিম্নক্ষয় শুরু করলে ভূমিভাগে যৌবনের চিহ্ন ফুটে ওঠে।

নদীর বােঝা হ্রাস : নদীর বােঝা কমলে নদীর গতিশক্তি বেড়ে যায়। নদী তখন সমস্ত শক্তিই নিম্নক্ষয়ে ব্যয় করে। ফলে ভূমিভাগে পুনরায় যৌবনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

জলবায়ুর পরিবর্তন : কোনাে নদী অববাহিকা অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তিত হলে (যেমন—মরু জলবায়ু থেকে আর্দ্র জলবায়ু) বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বহুগুণ বাড়ে। ফলে নদীতে জলপ্রবাহের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং নদী নিম্নক্ষয়ের মাধ্যমে ভূমিভাগে যৌবনের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তােলে।

পুনর্যৌবন লাভ :
নদীর পুনর্যৌবন লাভ : সমুদ্রপৃষ্ঠের অবনমন ঘটলে অথবা ভূপৃষ্ঠের উত্থান ঘটলে নদীর ক্ষয় করার ক্ষমতা বেড়ে যায় তখন সেই অবস্থাকে নদীর পুনর্যৌবন লাভ বলে।
ভূমিভাগের পুনর্যৌবন লাভ : ভূমিরূপের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে নদী পুরােনাে ভূমিভাগের ওপর নতুন উদ্যমে নিম্নক্ষয় শুরু করে। এর ফলে সমপ্রায় ভূমিরূপের ওপর যৌবনােচিত ভূমিরূপ অধ্যারােপিত হয়, একে ভূমিভাগের পুনর্যৌবন লাভ বলে।

পুনর্যৌবন লাভের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:
ভূমিভাগের পুনর্যৌবন লাভের ফলে যেসব ভূমিরূপ গড়ে ওঠে সেগুলি হল一

(১) নিক পয়েন্ট বা নিক বিন্দু : ভূমিরূপের পুনর্যৌবন লাভের ফলে নদীর দৈর্ঘ্য বরাবর মৃদু পুরাতন ঢাল ও খাড়া নতুন ঢালের সংযােগ বিন্দুতে যে খাঁজের সৃষ্টি হয়, তাকে নিক পয়েন্ট বলে। নিক বিন্দুর ওপরের অংশের মৃদু ঢালের সঙ্গে নীচের খাড়া ঢালের মধ্যে ভূপ্রকৃতিগত পার্থক্যের জন্য জলপ্রপাত গঠিত হয়। মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে নর্মদা নদীর ওপর ধোঁয়াধার নিক বিন্দুতে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়েছে। এই বিন্দুতে নদীর মস্তকমুখী ক্ষয় দ্রুত হতে থাকে। নদীক্ষয়ের নতুন শেষ সীমা অনুযায়ী নদী তার ঢালকে মসৃণ করার জন্য মােহানা থেকে উর্ধ্বপ্রবাহের দিকে ক্ষয় করতে শুরু করে। এইভাবে মস্তকমুখী ক্ষয়ের ফলে নিক পয়েন্ট পিছু হটতে থাকে এবং এক সময়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

(২) উপত্যকার মধ্যে উপত্যকা : ভূমিরূপের পুনর্যৌবন লাভের ফলে নিক বিন্দুর ওপর উর্ধ্ব উপত্যকা এবং নিক বিন্দুর নীচে নিম্ন উপত্যকার মধ্যে ভূমিরূপের প্রকৃতিগত পার্থক্য লক্ষ করা যায়। নদী অববাহিকার নিক বিন্দুর ওপরের অংশের ভূমিরূপ পরিণত বা বার্ধক্য অবস্থায় থাকে। কিন্তু নিক বিন্দুর নিম্নাংশে নদী গভীর নিম্নক্ষয়ের মাধ্যমে পুরােনাে উপত্যকার মধ্যে সংকীর্ণ ‘v আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি করে। নিক বিন্দুর ওপরের মৃদু ঢালবিশিষ্ট প্রশস্ত পুরােনাে উপত্যকা এবং নীচের খাড়া ঢালবিশিষ্ট নবীন উপত্যকার সংযােগস্থলে ঢালের বিচ্যুতিজনিত একটি স্কন্ধভূমি সৃষ্টি হয়। আবার, নিক বিন্দুর নীচে উপত্যকার আড়াআড়ি একটা প্রস্থচ্ছেদ নিলে দেখা যায় যে, নদীর পুরাতন উপত্যকার মধ্যে একটি নতুন উপত্যকা অবস্থান করছে। এইরূপ উপত্যকাকে উপত্যকার মধ্যে উপত্যকা বলে। মধ্যপ্রদেশে কপিলধারা জলপ্রপাতের 1 কিমি উর্দ্ধপ্রবাহে এই ধরনের ভূমিরূপ লক্ষ করা যায়।

(৩) নদীমঞ্চ : নদী উপত্যকায় অনেক সময় নদীর দু-পাশে এক বা একাধিক ধাপ বা মঞ্ দেখা যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের ঋণাত্মক পরিবর্তন, জলবায়ুর পরিবর্তন (মরু জলবায়ু থেকে আর্দ্র জলবায়ুতে পরিবর্তন) ইত্যাদির কারণের ফলে নদীর জলপ্রবাহের মাত্রা বেড়ে গেলে নদী নিম্নক্ষয়ের মাধ্যমে পুরাতন উপত্যকার ওপর উল্লম্বভাবে কেটে বসে যায়। ফলে নদীর উভয় পার্শ্বে পরিত্যক্ত মৃদু ঢালবিশিষ্ট উপত্যকা নবীন উপত্যকার কিছুটা ওপরে মঞ্চের আকারে অবস্থান করে। একে নদীমঞ্চ বলে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা প্রভৃতি নদীর উভয় তীরে নদীমঞ্চ দেখা যায়। নদীমঞ্চ পলি দিয়ে গঠিত হলে তাকে পলল মঞ্চ বলে। পলিহীন বা শিলা দ্বারা গঠিত নদীমঞ্চকে প্রস্তর শয্যা নদীমঞ্চ বলে। ভূমিভাগের পুনর্যৌবন লাভের ফলে সমান উচ্চতায় নদীর উভয় পার্শ্বে দুটি নদীমঞ্চ গড়ে উঠলে তাকে যুগল নদীমঞ্চ বলে। এ ছাড়া অসমান উচ্চতায় একাধিক নদীমঞ্চ গড়ে উঠলে তাকে অযুগল নদীমঞ্চ বলে।

(৪) কর্তিত বা খোদিত নদী বাঁক : পরিণত ও বার্ধক্য অবস্থায় নদী বড়াে বড়াে বাঁক নিয়ে প্রবাহিত হয়। ভূমিভাগের পুনর্যৌবন লাভের ফলে নদী নিম্নক্ষয়ের মাধ্যমে কেটে বসে যায় এবং পার্শ্বক্ষয়ের মাধ্যমে নদী উপত্যকা প্রশস্ত হতে থাকে। ফলে বৃহৎ বাঁকের সৃষ্টি হয়। এইরূপ নদীবাঁককে কর্তিত বা খােদিত নদীবাক বলে। ক্ষয় ও ভূমিরূপের প্রকৃতি অনুযায়ী কর্তিত নদীবাঁককে সাধারণত দুভাগে ভাগ করা হয়।

নদীর নিম্নক্ষয় প্রবল হলে নদী উল্লম্বভাবে কেটে বসে যায় এবং এর দুই পাড় খাড়া প্রাচীর দ্বারা আবদ্ধ হয়। একে খাড়া পরিখাবিশিষ্ট নদীবাঁক বলে।

কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে নদীর নিম্নক্ষয় অপেক্ষা পাশ্বক্ষয় বেশি হলে নদী একদিকে সরতে থাকে। ফলে নদীর উভয় পাড়ের ঢাল সমান হয় না। এক পাড় বেশ খাড়া এবং অন্য পাড় অপেক্ষাকৃত মৃদু ঢালযুক্ত হয়। এইরুপ নদীবাঁককে অসম খাড়া পরিখাবিশিষ্ট নদীবাঁক বলে।

(৫) উত্থিত সমুদ্রসৈকত ও সমুদ্র মঞ্চ : বহুকাল ধরে উপকূল-ভাগে ক্ষয়ের ফলে অবক্ষেপহীন বা অবক্ষেপযুক্ত সৈকতভূমি গড়ে ওঠে। এই অবস্থায় উপকূলভাগ উত্থিত হলে বা সমুদ্রপৃষ্ঠ নেমে গেলে পূর্বের সৈকতভূমি বর্তমান সমুদ্রতল অপেক্ষা ঊর্ধ্বে মরে আকারে অবস্থান করে। এই মঞ্চের উচ্চতা 50 মিটারের কম হলে তাকে উথিত সমুদ্রসৈকত বলে। এর উচ্চতা 50 মিটারের বেশি হলে তাকে সমুদ্র মঞ্চ বলে। গ্রেট ব্রিটেনের দক্ষিণ ও পশ্চিম অংশে উখিত সমুদ্রসৈকত গড়ে উঠেছে।

Welcome Visitor

Rlearn Education
error: Content is protected !!