মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা|Meerut Conspiracy Case

Question: কোন পরিস্থিতিতে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯) শুরু হয়? এই মামলায় অভিযুক্ত কয়েকজন শ্রমিক নেতার নাম লেখো। এই মামলার ফলাফল কী হয়েছিল?
অথবা,
মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯) কী? এই প্রেক্ষাপট কী ছিল? এই মামলার পরিণতি কী হয়েছিল?
অথবা,
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির অবদানের একটি উদাহরণ দাও। এপ্রসঙ্গে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার প্রেক্ষাপট আলোচনা কর। এই মামলার গুরুত্ব ব্যাখ্যা কর |

মিরাট ষড়ষন্ত্র মামলা : মাধ্যমিক ইতিহাস

ভূমিকা : ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার পর ভারতে দ্রুতগতিতে কমিউনিস্ট ভাবধারার প্রসার ঘটতে থাকে। ভারতে শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে ব্রিটিশ সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এইরূপ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছিল। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯) হল এরকমই এক দমননীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

মামলার প্রেক্ষাপট :

১) শ্রমিক-মালিক বিরোধ: ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে ভারতে শিল্পায়ন শুরু হলে শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব হয়। বিংশ শতকের প্রথম দিকে মালিক শ্রেণির শোষণ ও অত্যাচারে শ্রমিক-মালিক সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। শ্রমিক শ্রেণির অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে কমিউনিস্টরা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন জোরদার করে তুলে ব্রিটিশ সরকার চিন্তায় পড়ে যায়।

২) পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি: ১৯২৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে প্রায় পঁচিশ হাজার শ্রমিক যোগ দেয়। এখানে তারা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলে যা ব্রিটিশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৩) হুইটলি কমিশন নিয়োগ: ক্রমাগত শ্রমিক অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৯২৯ সালে হুইটলি কমিশন নিয়োগ করে। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণি এই কমিশন বর্জন করে।


৪) শ্রমিক বিরোধী বিল: লর্ড আরউইন তাঁর জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে ‘শিল্পবিরোধ বিল’ (Trade Disputes Bill) ও ‘জননিরাপত্তা বিল’ (Public State Bill) পাশ করে। এই আইনের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরা সোচ্চার হলে সরকার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।এই পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ ও তাদের নেতৃত্বে শ্রমিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ সালে ৩৩ জন কমিউনিস্ট শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এই মামলাই ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত।

মামলার পরিণতি :

১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত এই মামলা চলে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই মামলার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায়না।

  • ১) ১৯৩৩ সালে এই মামলার রায়ে কমিউনিস্ট পার্টির যাবতীয় প্রচারকার্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
  • ২) এই মামলার ফলে বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতার দীর্ঘ মেয়াদি কারাদন্ড হয়।
  • ৩) ভারতে কমিউনিস্ট আদর্শের প্রসার রোধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার কঠোর দমন নীতি গ্রহণ করে।
  • ৪) ১৯৩৪ সালে শ্রমিক আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব লক্ষ্য করে সরকার কমিউনিস্ট পার্টি ও তার সকল শাখা সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
  • ৫) ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার রায়ে কমিউনিস্ট পার্টির যাবতীয় প্রচারকার্য নিষিদ্ধ করা হয়। বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতার বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ঘােষণা করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড প্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুজাফফর আহমেদ, শওকত উসমানি, কে. এন. জোগেলকর, শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে, শিবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ধরণি গােস্বামী, পি. সি. যােশি, গঙ্গাধর অধিকারী, ফিলিপ স্প্র্যাট প্রমুখ।

গুরুত্ব / তাৎপর্য :

এই দমন-পীড়ন সত্ত্বেও ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির অবদান নির্ণয়ে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার গুরুত্ব অপরিসীম।

  • ১) এই মামলায় গান্ধিজি কমিউনিস্ট নেতাদের সমর্থন করলে কমিউনিস্টদের উৎসাহ বাড়ে।
  • ২) জেলে বন্দি বামপন্থী নেতাদের আদর্শ ও বক্তব্য সংবাদপত্রের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে পৌঁছালে ভারতে সমাজতন্ত্রের আদর্শ দ্রুত প্রসার লাভ করে।
  • ৩) সরকার ১৯৩৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করলে এই পার্টির প্রভাব শ্রমিক শ্রেনির ওপর বেড়ে যায়।
  • ৪) এর ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

উপসংহার: ব্রিটিশ সরকার ভারতে বামপন্থী আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ শুরু করে। এই মামলার রায়ে ৩৩ জন গুরুত্বপূর্ণ কমিউনিস্ট নেতার কারাদণ্ড হলে ভারতে বামপন্থী আন্দোলন সংকটের মুখে পড়ে। কিছুদিনের মধ্যে সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে বামপন্থী আন্দোলন আপাতত স্তিমিত হয়ে পড়ে।

Welcome Visitor

Rlearn Education
error: Content is protected !!