রিউম্যাটোলজির নানা অসুখ |Rlearn

অসুখ হাজার রকমের। তাঁর উপসর্গও
সেরকম রকমারি। চারদিকে নানান বিশেষজ্ঞের উপদেশ শুনে শুনে আপনি ক্লান্ত। এর ফলে হয়তো সামান্য কিছু হলেই আপনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ছেন; আবার অন্যদিকে হয়তো সাংঘাতিক অসুখের উপসর্গ শুরু হয়েছে, কিন্তু বুঝতে না পেরে নিশ্চিন্তে বসে আছেন। তাই পরিচিত কিছু অসুখের উপসর্গ এক ঝলক দেখে নিলে জীবনের পুরোটাই লাভ। এখানে সেইরকম কিছু অসুখের উপসর্গ নিয়েই আলোচনা করা হল।

রিউম্যাটোলজির নানা অসুখ :
রিউম্যাটোলজির নানা অসুখ আমাদের দেশে অনেকের মনেই এই ধারণা রয়েছে যে
রিউম্যাটোলজির অসুখ মানেই বাত। বাত বা বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ব্যথা অবশ্যই রিউম্যাটো – লজির একটা বড় অংশ। কিন্তু এছাড়াও এই বিভাগে আরও অনেক অসুখের চিকিৎসা হয়। এদের মধ্যে অনেক অসুখ রয়েছে যেগুলি মাল্টি-সিস্টেমিক, অর্থাৎ, অস্থিসন্ধি তো বটেই, তাছাড়াও অন্য অনেক অঙ্গ, যেমন কিডনি, মস্তিষ্ক বা ত্বকের ক্ষতি করতে
পারে। তাই রিউম্যাটোলজির অসুখ মানেই বৃদ্ধ বয়সে হাঁটুর ব্যথা, এরকম ভাবার কোনও
কারণ নেই। যে সব মাল্টি সিস্টেমিক অসুখের কথা বললাম, তাদের সিংহভাগই হয় জীবনের
দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাগে। মহিলারা এই ধরনের অসুখে বেশি আক্রান্ত হন।

এস এল ই (সিস্টেমিক লুপাস এরিথিম্যাটোসাস) : এই সমস্ত অসুখের মধ্যে সবথেকে খতরনাক বোধহয় এই এস এল ই। এমন কোনও অঙ্গ নেই, যেটা এই অসুখে আক্রান্ত হয় না। এই অসুখের একটা নজর – কাড়া প্রাথমিক লক্ষণ হল চামড়ায় নানা র‍্যাশ। মুখে, নাকের দুপাশে গালের ওপর লাল লাল র‍্যাশ দেখা দেয়। তারপর এই র‍্যাশ ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা দেহে। এর সঙ্গেই হয় জায়েন্টে ব্যথা এবং কিডনির গোলমাল। খুব তাড়াতাড়ি কিডনি খারাপ হয়ে সারা শরীর ফুলে যেতে পারে। এই অসুখ থেকে মুখের ভেতর ঘা হয়, পেটে বা বুকে জল জমে যেতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে খিঁচুনি হয়ে মস্তিষ্কে এনসেফালাইটিসের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে (নিউরোলুপাস)। এই ধরনের রোগীর দেহের চামড়া রোদে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়।

• রিউম্যাটয়েড আথ্রাইটিস :
এই বিভাগের অসুখগুলির মধ্যে এই অসুখেই সবথেকে বেশি কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। এই অসুখ হয় মধ্যবয়সে। মানে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে, যখন আপনি জীবনের নানা ক্ষেত্রে সাফল্যের দিকে এগিয়ে চলেছেন, সেই সময়েই হঠাৎ এই অসুখের আবির্ভাব আপনার জীবনের সব আনন্দ কেড়ে নিতে পারে। সেই যে মাঝে মাঝে দেখবেন বাতে হাতে-পায়ের আঙুল বেঁকে গিয়ে রোগী পুরো কর্মক্ষমতাহীন হয়ে যায়, সেই অবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী এই রিউম্যাটয়েড আথ্রাইটিস।
এছাড়াও আরও কিছু কিছু বাতের অসুখে এরকম হাতের আঙুল বেঁকে যেতে পারে। কিন্তু রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস থেকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়। এই অসুখে শুরু থেকেই হাতে-পায়ের আঙুলে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। এই ব্যথা বিশেষত বাড়ে সকালের দিকে আর শীতকালে। প্রথমেই যে বেঁকে যায়, তা নয়, কিন্তু যদি বহুদিন চিকিৎসাবিহীনভাবে রোগী থাকেন, তখন আঙুল বেঁকে যাবে। আঙুল ছাড়াও কাঁধে বা হাঁটুতেও একরকম ব্যথা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই অসুখে চামড়ায় নোডিউল দেখা দেয়। ফুসফুসেও নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং হাঁপানির মতো উপসর্গ শুরু হতে পারে।

• স্ক্লেরোডারমা :
এই অসুখের মূল উপসর্গ হল সারা শরীরের চামড়া মোটা হয়ে যাওয়া। এমন মোটা আর শক্ত হয়ে যায় চামড়া যে আঙুল সোজা করার ক্ষমতাও থাকে না। হাতের আঙুল বেঁকে যায়, মুখ খুলতেও অসুবিধা হয়। এছাড়া হাতের আঙুলে রক্ত চলাচল কমে যায় এবং ঠান্ডা জলে হাত দিলেই কনকনে ব্যথা শুরু হয় | এরকম হতে হতে অনেক সময় আঙুলে পচন ধরে যায় এবং পরে শুকিয়ে আঙুলের অগ্রভাগ বসেও যেতে পারে। এছাড়া এই অসুখে কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, চামড়ার নীচে ক্যালশিয়াম জমে যেতে পারে | খাদ্যনালীর প্রথম অংশ, অর্থাৎ ইসোফেগাস স্ফীত হয়ে পাকস্থলীর অ্যাসিড উপরের দিকে উঠে আসতে পারে। ফুসফুসে ফাইব্রোসিস হয়ে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হতে পারে। একদম শেষ অবস্থার এই অসুখে হৃৎপিণ্ডের পাম্প করার ক্ষমতাও আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায় |

• জগরেন সিনড্রোম :
এই অসুখে মুখের এবং চোখের গ্ল্যান্ড শুকিয়ে যায় এবং লালারস বা অশ্রু তৈরি হয় না। এর ফলে চোখ নানা ইনফেকশানের কবলে পড়তে পারে এবং কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মুখে লালারস থাকে না বলে দাঁত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং মুখে নানা ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়া গাঁটে গাঁটে ব্যথা হতেই পারে, কিছু ক্ষেত্রে শিরদাঁড়ার নার্ভতত্ত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এই অসুখে একটি প্রধান ভয় হল বিরল কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে লিমফোমা জাতীয় ক্যান্সারের উদ্ভব। সাধারণত অনেক দিন অসুখ থাকার পরেই এই ক্যান্সার দেখা দেয়।

অ্যানকাইলোজিং স্পনডিলাইটিস:
এটি এক বিরল ধরনের কোমরের বাত। শিরদাঁড়ার শেষ অংশ যেখানে কোমরের হাড়ের সঙ্গে জুড়েছে, সেই স্যাক্রো-ইলিয়াক সন্ধিতে এই বাত শুরু হয়। প্রথমে শুরু হয় কোমরের পেছনের দিকে ব্যথা দিয়ে। একদিকে ব্যথা শুরু হয়, তারপর ছড়িয়ে যায় দু’দিকেই। রাতে ব্যথায় ঘুম হয় না। সকালে উঠেও কোমর শক্ত হয়ে থাকে, চলাফেরা করা দুষ্কর হয়ে ওঠে। তবে এখানেই এই ব্যথা থেমে থাকে না, আস্তে আস্তে এই বাতের প্রভাব শিরদাঁড়া বেয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে। তার অর্থ হল, শিরদাঁড়ার হাড়গুলি ধীরে ধীরে বংশদণ্ডের মতো শক্ত এবং অনমনীয় হয়ে যায়। তখন পাশ ফিরে তাকানো বা ঘাড় ঘোরানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একটা সময়ের পর রোগীর পক্ষে সাধারণ ঘরের কাজ করাও আর সম্ভব হয় না। এছাড়াও এই অসুখে চোখে নানা প্রদাহ হতে পারে, এর থেকে অন্ধত্ব আসাও অসম্ভব নয়। হাঁটু বা গোড়ালিতেও ফুলে ব্যথা হতে পারে। এই অসুখ যদি বিনা চিকিৎসায় পাঁচ-সাত বছর থাকে, তাহলে যে ক্ষতি হবে, তার আর মুক্তি সম্ভব নয়। তাই নিয়ম হল তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা। বায়োলজি- ক্যাল থেরাপি ঠিক সময়ে শুরু করলে এই অসুখ আটকে দেওয়া সম্ভব।

অস্টিওআর্থ্রাইটিস :
যে কথা দিয়ে এই অধ্যায় শুরু করেছিলাম, সেই হাঁটুর ক্ষয়রোগ হল অস্টিওআর্থ্রাইটিস। মানে হাঁটুর হাড় এবং কারটিলেজ ক্ষয়ে যাওয়া। কাদের বেশি এই অসুখ? যাদের ওজন ক্রমাগত বাড়ছে, তাদের এই অসুখ হওয়ার চান্স বেশি। অথবা যারা ক্রমাগত ভারী জিনিস বয়ে নিয়ে চলেন, যেমন দিনের মধ্যে দশ-বারোবার ভারী জলের বালতি বয়ে
নিয়ে যাওয়া বাড়ির মহিলা বা মোটবাহক শ্রমিক, এদের এই অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া ক্রমাগত উবু হয়ে বসে কাজ করলেও এই অসুখ হতে পারে। শুধু হাঁটুতে নয়, হিপ জয়েন্টেও এই ক্ষয় হতে পারে।এর মূল উপসর্গ হল ব্যথা। কিছুক্ষণ হাঁটলেই হাঁটু বা কোমরে ব্যথা শুরু হবে। তারপর সেই ব্যথা নামবে পায়ের পাতা অবধি। এছাড়া হাঁটু ‘লক’ হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গও হতে পারে। অর্থাৎ মনে হবে চলতে চলতে হঠাৎ করেই হাঁটু যেন আটকে গেল, আর পা বাড়ানোই যাচ্ছে না। অনেকে বলেন হাঁটতে গেলেই হাঁটুর মধ্যে খট খট করে শব্দ হচ্ছে। এই অসুখ মানে হাড়ের ক্ষয়। সুতরাং যেটুকু হয়ে গেছে, তা আর ওষুধ দিয়ে ঠিক করা সম্ভব নয়। কিন্তু চেষ্টা করা যেতে পারে যাতে আর বাড়াবাড়ি না হয়। প্রথম কথা হল, ওজন কমাতেই হবে। এবং সে জন্য ডায়েট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তারপরও কাজ না হলে হাঁটু পাল্টানোর অপারেশান।

• মায়োসাইটিস :
সম্প্রতি ভারতের এক বিখ্যাত অভিনেত্রীর এই অসুখ হওয়ায় অনেকেই এখন এর নাম জেনেছেন। অবশ্য অসুখটি নতুন নয়। প্রতি বছর বেশ কিছু মানুষ এতে আক্রান্ত হন। এই অসুখে শরীরের মাংসপেশি আক্রান্ত হয়। নানা মাংসপেশি অকেজো হয়ে পড়ে এবং কাজ করার শক্তি লোপ পায়। হাঁটা তো দূরের কথা, অনেক সময়ে ঘাড় তোলার ক্ষমতাও থাকে না। এর সঙ্গেই ফুসফুস আক্রান্ত হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে সেটা প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। এই অসুখের অনেকগুলো ভাগ রয়েছে। যেমন এর একটি ভ্যারাইটিতে মাংসপেশির সঙ্গে সঙ্গে চামড়াও আক্রান্ত হয় এবং চোখের ওপরে র‍্যাশ দেখা দিতেপারে।

• সার্কয়েডোসিস :
এটি তুলনায় বিরল অসুখ, কিন্তু যাদের হয়, তাদের সারা জীবন নানা সমস্যায় জর্জরিত হতে হয়। এই অসুখ মূলত হয় ফুসফুসে। ফুসফুসে লিম্ফ গ্ল্যান্ড ফুলে যায়, এবং ফুসফুসের ঝিল্লিতে ফাইব্রোসিস শুরু হয়। অনেক সময়ে এটি প্রচণ্ড বাড়াবাড়ি হয়ে রোগী অক্সিজেন নির্ভর জীবন কাটাতে বাধ্য
হয়। কখনও কখনও চোখে প্রদাহ হয় এবং রেটিনা অবধি আক্রান্ত হতে পারে। কিডনি এবং হৃৎপিণ্ড আক্রান্ত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়। বেশি বিপজ্জনক হল এই অসুখে মস্তিষ্কের প্রদাহ। সেটি কিন্তু অনেক সময়েই খিঁচুনি হিসাবে দেখা দেয়। চোখ বা মুখের নার্ভতত্ত্ব আক্রান্ত হতে পারে। অনেক সময়ে মস্তিষ্কের সার্কয়েডোসিস অন্যান্য রোগকে নকল করে এবং চিকিৎসকদের বোকা বানায়। সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা না হলে এই রোগ ধরা পড়ে না। ত্বকে খুব বেদনাদায়ক র‍্যাশ
নিয়েও এই রোগের সূচনা হতে পারে।

Welcome Visitor

Rlearn Education
error: Content is protected !!