1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ বা সিপাহী বিদ্রোহ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা |

আলোচনার বিষয় :
মহাবিদ্রোহের কারণ
মহাবিদ্রোহের সূচনা ও বিস্তার
মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব ও দমনকারী
বিদ্রোহের প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন মত
বিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণ
মহাবিদ্রোহের ফলাফল |


ভূমিকা : অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতকে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন এবং শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হল 1857 খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ বা সিপাহি বিদ্রোহ। গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং-এর সময়ে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই ঘটনাটিকে ভারতীয় ইতিহাসের ‘জলবিভাজিকা’ হিসেবে চিহ্নিত করার কারণ হল এই প্রথম কোনো ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী ছাড়াই দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দেয়। তাই এই বিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর সাভারকর ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন।


মহাবিদ্রোহের কারণ :

প্রত্যক্ষ কারণ :
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ‘এনফিল্ড রাইফেল’-এর প্রচলন: এই রাইফেলে গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো কার্তুজ দাঁতে কেটে ভরতে হত।এর ফলে হিন্দু ও মুসলমান সিপাহিদের ধর্মনাশের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে গুজব রটে। এইজন্য সিপাহীরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে |

রাজনৈতিক কারণ :

লর্ড ওয়েলেসলি প্রবর্তিত অধীনতামূলক মিত্ৰতা নীতি:
(i) দেশীয় রাজ্যগুলিকে অভ্যন্তরীণ ও
বৈদেশিক আক্রমণ থেকে নিরাপত্তা দানের বিনিময়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করানো হয়। (ii) এই নীতির দ্বারা হায়দ্রাবাদ, তাঞ্জোর, সুরাট, কর্ণাটক, অযোধ্যা, উদয়পুর, যোধপুর, জয়পুর ইত্যাদি দেশীয় রাজ্য ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন হয়।

লর্ড ডালহৌসি প্রবর্তিত স্বত্ববিলোপ নীতি:

(i) কোনো রাজ্যের রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে, সেই রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হবে এবং সেই রাজার দত্তকপুত্রের অধিকার বাতিল বলে গণ্য করা হয়। (ii) এই নীতির ফলে সাতারা, সম্বলপুর, উদয়পুর, ঝাঁসি, নাগপুর, কর্ণাটক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।

ব্রিটিশ আশ্রিত রাজ্যগুলির নিরাপত্তাহীনতা:

(i) দেশীয় রাজ্যগুলির ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্তির ফলে আশ্রিত রাজারা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন। (ii) ত্রিবাঙ্কুর, কাথিয়াবাড়, রাজপুতানা সহ অন্যান্য রাজ্য ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হওয়ার জন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

ভাতা, উপাধি বিলোপ: নানা সাহেবের বৃত্তি বন্ধ, কর্ণাটকের রাজপরিবারের ভাতা বন্ধ, বাহাদুর শাহের উপাধি বিলোপ প্রভৃতি ঘটনা মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করে।

কুশাসনের অজুহাতে রাজ্যগ্রাস: এ ছাড়াও অযোধ্যা দখল এবং রাজপরিবারের সদস্যদের বিতাড়িত করে রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠন ভারতীয়দের অসন্তোষ বাড়ায়।

সামরিক কারণ :

● ভারতীয় সিপাহিদের বেতন অত্যন্ত কম ছিল। অভিজ্ঞতা থাকলেও তাদের পদোন্নতির বিশেষ সুযোগ ছিল না।
● ইংরেজ অফিসাররা ভারতীয় সিপাহিদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং দুর্ব্যবহার করত। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায় হিন্দু সিপাহিদের তিলক কাটা ও মুসলমান সিপাহিদের দাড়ি রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়।
● 1824 খ্রিস্টাব্দে ইঙ্গ-ব্রত্ম যুদ্ধে সিপাহিদের সমুদ্র (কালাপানি) পেরিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
● 1856 খ্রিস্টাব্দে ক্যানিং ‘General Service Enlistment Act’ দ্বারা সিপাহিদের যে-কোনো স্থানে যুদ্ধে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, কিন্তু দূরদেশে যুদ্ধে গেলেও সিপাহিরা তাদের প্রাপ্য। ভাতা বা বাট্টা পেত না।

অর্থনৈতিক কারণ :

● কোম্পানি প্রবর্তিত ভূমিব্যবস্থায় কৃষকদের উচ্চহারে রাজস্ব প্রদান করতে হত।

● চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, রায়তওয়ারি, মহলওয়ারি, তালুকদারি প্রভৃতি বন্দোবস্তগুলি কৃষকদের উপর শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি করেছিল।

● এই সময় নীলকর, পথকর, গো-চারণ কর, চৌকিদারি কর প্রভৃতি চালু করা হয়।

● কোম্পানি বিনাশুল্কে এদেশে একচেটিয়া বাণিজ্য করায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।

● 1757-1857 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত থেকে প্রচুর মূল্যবান ধাতু (সোনা, রুপো) ইংল্যান্ডে প্রেরণ করে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ :

● ইংরেজরা ভারতীয়দের ঘৃণার চোখে দেখত এবং তাদের ‘কালা আদমি’, ‘নেটিভ’, ‘বর্বর-অসভ্য’ প্রভৃতি বলে সম্বোধন করত।

● হিন্দু বিধবাবিবাহ আইন, সতীদাহপ্রথা রদ, স্ত্রী-শিক্ষা, শিশুহত্যা নিবারণ ইত্যাদি ঘটনা গুলিকে ভারতবাসী ধর্মনাশের প্রচেষ্টা বলে মনে করে। খ্রিস্টান মিশনারিরা ভারতবাসীদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করলে এই অসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পায়।

● মন্দির-মসজিদ ইত্যাদি ধর্মীয় এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের উপর কর আরোপ করা হয়।

● হিন্দু উত্তরাধিকার আইন বিশেষত পৈতৃক সম্পত্তিতে ধর্মান্তরিত ব্যক্তি ও নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা রক্ষণশীল হিন্দু সমাজকে ক্ষুব্ধ করে।

মহাবিদ্রোহের সূচনা ও বিস্তার :

29 মাৰ্চ, 1857 খ্রি :

● ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে মঙ্গল পাণ্ডে চর্বি মেশানো কার্তুজ ব্যবহারে অসম্মত হন।
● এই কারণেই তিনি ঊর্ধ্বতন সেনা আধিকারিককে হত্যা করেন এবং বিদ্রোহের সূচনা হয়।

10 মে, 1857 খ্রি :

● মীরাটে সেনা ছাউনিতে সিপাহিরা বিদ্রোহ শুরু করেন।
● উধ্বর্তন ইংরেজ আধিকারিকদের হত্যা এবং লুঠতরাজ চালানো হয়।

11-30 মে, 1857 খ্রি :

● মীরাটে সেনা ছাউনি থেকে বিদ্রোহী সিপাহিরা 11 মে দিল্লি এসে পৌঁছান।
● মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে ‘হিন্দুস্থানের সম্রাট’ ঘোষণা করে সিপাহিরা তাঁর নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু করেন। সিপাহিরা দিল্লি দখল করে নির্বিচারে ইংরেজদের হত্যা করেন।
● ফিরোজপুর, বোম্বাই, আলিগড়, নাসিরাবাদ, বেরিলি, মোরাদাবাদ, শাহজাহানপুরে বিদ্রোহ
ছড়িয়ে পড়ে।

জুন, 1857 খ্রি :

● 4 জুন কানপুর সেনা ছাউনিতে বিদ্রোহ শুরু হয়।
● এই সময় গোয়ালিয়র, ভরতপুর, ঝাঁসি, এলাহাবাদ, ফৈজাবাদ, সুলতানপুর, লখনউ, ইত্যাদি স্থানেও বিদ্রোহের সূচনা হয়। সিন্ধু গাঙ্গেয় উপত্যকা এবং রাজপুতানা, মধ্য ভারত ও বাংলার বেশ কিছু অংশে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

● লখনউ রেসিডেন্সি দখলের সময় বিদ্রোহিদের হাতে ব্রিটিশ আধিকারিক হেনরি লরেন্স নিহত হন।

● বহু যুদ্ধের পর মেজর জেনেরল হ্যাভলক নানা সাহেব কে পরাজিত করে কানপুর পুনর্দখল করেন।

জুলাই, 1857 খ্রি : ইন্দোর, মহোও, সগর এবং পাঞ্জাবের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

সেপ্টেম্বর, 1857 খ্রি: ইংরেজরা দিল্লি পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু মধ্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল।

অক্টোবর, 1857 খ্রি: কোটা রাজ্যে বিদ্রোহ শুরু হয়।

নভেম্বর, 1857 খ্রি: বিদ্রোহীরা কানপুরের বাইরে জেনারেল উইন্ডহামকে পরাস্ত করে।

ডিসেম্বর, 1857 খ্রি: স্যার কলিন ক্যাম্পবেল কানপুরের যুদ্ধে জয়লাভ করেন।

মাৰ্চ, 1858 খ্রি: ইংরেজরা লখনউ পুনরুদ্ধার করে।

এপ্রিল, 1858 খ্রি: ঝাঁসি ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়। কুনওয়ার সিং-এর নেতৃত্বে বিহারে বিদ্রোহ শুরু হয়।

মে, 1858 খ্রি :
● ইংরেজরা বেরিলি, জগদীশপুর এবং কাল্পি পুনরুদ্ধার করে।
● রোহিলখন্ডে বিদ্রোহীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ শুরু করে।

জুলাই-ডিসেম্বর, 1858 খ্রি: সমগ্র ভারতবর্ষ পুনরায় ইংরেজরা অধিকার করে নেয়।


মহাবিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ :

লর্ড ক্যানিং: লর্ড ক্যানিং ভাইসরয় হিসেবে ভারতে বিভিন্ন সংস্কার সাধন করেছিলেন, তিনি স্বত্ববিলোপ নীতি বন্ধ করেছিলেন। তার উপদেষ্টামণ্ডলী ‘ইমপেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ নামে পরিচিত ছিল। এর সদস্যদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা পদ দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা বিভাগগুলি পরিচালনা করতে পারেন। এটা ‘Canning model of Business’ নামে পরিচিত ছিল।


দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ : দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের আসল নাম ছিল বাহাদুর শাহ জাফর। তিনি ছিলেন ভারতের শেষ মুঘল সম্রাট এবং তাকে সিপাহি বিদ্রোহের সিপাহিরা রাজা নির্বাচিত করে তার নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু করেছিল। এই বিদ্রোহে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দিল্লিতে নির্বিচারে ইংরেজদের হত্যা করার ফলে ইংরেজ সৈন্যরা তাকে ও তার পরিবারকে গ্রেফতার করে। অবশেষে মেজর উইলিয়াম হাডসন তাকে গ্রেফতার করে। তাকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়।


নানা সাহেব: নানা সাহেব ছিলেন সিপাহি বিদ্রোহের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাঁর আসল নাম ছিল ধন্দু পন্থ (Dhondu
Pant)। নানাসাহেব এবং সিপাহিরা কানপুর থেকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেন। তাতে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরে ব্রিটিশদের হাতে পরাজিত হয়ে তিনি উত্তরপ্রদেশের বিথুরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা তাকে অনেক চেষ্টা করেও ধরতে পারেনি। 1858 খ্রিস্টাব্দে রানি লক্ষ্মীবাঈ এবং তাঁতিয়া টোপি তাকে গোয়ালিয়রের পেশোয়া ঘোষণা করেন। মনে করা হয়, 1859 সাল নাগাদ তিনি নেপালে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

বেগম হজরতমহল : সিপাহি বিদ্রোহের একজন মহিলা নেতা ছিলেন বেগম হজরত মহল। তিনি ‘আওয়াধের বেগম’ নামে পরিচিত ছিলেন। মহাবিদ্রোহের সময় রাজা জয়লাল সিং-এর নেতৃত্বে বেগম হজরত মহলের অনুগামীরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল এবং লখনউ নিজেদের দখলে নিয়েছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে তার অভিযোগ ছিল যে, তারা রাস্তা বানানোর জন্য মন্দির ও মসজিদ ধ্বংস করছে। ব্রিটিশরা নিজেদের ঘোষণাপত্রে যে পূজা পাঠের কথা বলেছিল তাকে তিনি ব্যঙ্গ করেছিলেন মহাবিদ্রোহের শেষপর্বে। 1984 সালে ভারত সরকার তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্ট্যাম্প প্রকাশ করেছেন।

কলিন ক্যাম্পবল : মহাবিদ্রোহের সময় ক্যাম্পবল ছিলেন ব্রিটিশ দ্বারা নিয়োজিত ভারতের সেনাপ্রধান। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির সৈন্যদের এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি কানপুরে তাঁতিয়া টোপিকে পরাস্ত করে বিদ্রোহীদের থেকে লখনউ পুনর্দখল করেছিলেন।

তাঁতিয়া টোপি/তোপি: তাঁতিয়া টোপি নানা সাহেবের সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে 1857- এর মহাবিদ্রোহে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার পদবি ‘তোপি’ কথার অর্থ কমান্ডিং অফিসার। কামানের হিন্দি শব্দ থেকে এটি এসেছে। যুদ্ধে পারদর্শিতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁতিয়া তোপি একজন দুর্দান্ত সৈনিক ছিলেন। গেরিলা যুদ্ধে তার পারদর্শিতা লক্ষ্যণীয় ছিল। প্রথমে কানপুর এবং পরে গোয়ালিয়রের যুদ্ধে তিনি ঝাঁসির রানি লক্ষীবাঈ-এর সাহায্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তার গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে অবাক করে দিয়েছিল। তিনি কিছুদিন রাজা মান সিং- এর সঙ্গে ছিলেন। তারপর মান সিং-এর
প্রতারণার জন্য জঙ্গল থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

খান বাহাদুর খান : খান বাহাদুর খান হাফিজ রহমত খানের পৌত্র ছিলেন। 1857-এর মহাবিদ্রোহের সময় তিনি বেরিলিতে নিজেদের সরকার গঠন করেছিলেন। বিদ্রোহে ব্যর্থ হয়ে তিনি নেপালে পালিয়ে যান এবং সেখানে ধরা পড়েন। পরে 1860 সালে কোতয়ালিতে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

লক্ষ্মীবাঈ : রানি-লক্ষীবাঈ-এর আসল নাম ছিল মনিকর্ণিকা। ঝাঁসির রাজার সঙ্গে বিবাহ হওয়ার পর তার নাম হয় লক্ষীবাঈ। মহারাজ গঙ্গাধর রাও-এর মৃত্যুর পর স্বত্ববিলোপ নীতি অনুযায়ী ব্রিটিশরা রানিকে এক বার্ষিক পেনশন প্রদানের প্রস্তাব দেন এবং তাকে ঝাঁসি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে মীরাটে বিদ্রোহ শুরু হয়। তাঁতিয়া টোপি এবং অন্যান্য বিদ্রোহী সেনাদের সাহায্যে রানি গোয়ালিয়র দুর্গ দখল করেন। সেখানেই যুদ্ধকালীন 1858 সালে তার মৃত্যু হয়। রানি লক্ষীবাঈ সর্বদা স্বাধীনতার জন্য তার সাহসিকতা ও নারীশক্তির জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

কুনওয়ার সিং: কুনওয়ার সিং বিহার থেকে মহাবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধে তার অবদান কোনো অংশে কম ছিল না। তিনি এবং তার সৈন্যরা আরায় জেলার প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র দখল করেছিলেন। তারপর ব্রিটিশ অফিসার মেজর ভিনসেন্ট আইয়ার আরা পুনরায় দখল করেন। কুনওয়ার সিং গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি উত্তরপ্রদেশের আজমগড় দখল করেন। তার প্রচুর সাহসিকতার জন্য তাকে বীর কুনওয়ার সিং বলা হত। 1966 সালে ভারত সরকার তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্ট্যাম্প প্রকাশ করেছেন।


মেজর উইলিয়াম টেলর : ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সৈনিক ছিলেন উইলিয়াম টেলর। জগদীশপুরে বিদ্রোহে সিপাইদের দমন করেছিলেন তিনি।


লিয়াকত আলি: তিনি এলাহাবাদের একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন এবং 1857-এর মহাবিদ্রোহে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ব্রিটিশরা পরে এলাহাবাদ দখল করলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। তিনি রেঙ্গুনে মারা যান।

জেনারেল হিউরোজ: সিপাহি বিদ্রোহে ঝাঁসিতে ভারতীয় সেনাদের দমন করতে ব্রিটিশ বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল হিউরোজ।গোয়ালিয়রেও ভারতীয় সেনাদের তিনি কঠোর হাতে দমন করেছিলেন। ঝাঁসি পুনদর্খলের সময় তিনি
তাঁতিয়া টোপি ও তার সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেছিলেন।

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি সম্বন্ধে বিভিন্ন মতামত:
1857 খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রকৃতি নির্ধারণে অনেক মতবিরোধ দেখা যায়।

● ডিসরেলি-এর মতে এই বিদ্রোহ ছিল: “একটি জাতীয় বিদ্রোহ।”

● ড. তারাচাদের মতানুযায়ী: “মধ্যযুগীয় এই বিদ্রোহ ছিল মূলত ক্ষমতাচ্যুত শ্রেণির ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা।”

● জে আউট্রাম এবং ডব্লিউ টেলরের মতানুযায়ী এই বিদ্রোহ ছিল: “হিন্দু-মুসলিম যৌথ ষড়যন্ত্র।”

● জওহরলাল নেহরুর মতে: “এই বিদ্রোহ শুধুমাত্র সিপাহিদের বিদ্রোহ ই নয়, বরং তা ভারতে অসামরিক বিদ্রোহেরও ভিত্তি
রচনা করে। প্রকৃতিগতভাবে সামন্ততান্ত্রিক হলেও এই বিদ্রোহে কিছু জাতীয়তাবাদী উপাদান মজুত ছিল।”

● সাভারকরের মতানুযায়ী এটি ছিল: “ভারতের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ।”

● আর সি মজুমদারের মতানুযায়ী: “এই বিদ্রোহ না প্রথম, না জাতীয়, না স্বাধীনতার যুদ্ধ।”


● টি আর হোমস্-এর মতে এই বিদ্রোহ ছিল: “সভ্যতা এবং বর্বরতার মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব।”

মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণসমূহ:


মহাবিদ্রোহে বিদ্রোহী সেনাদের সঙ্গে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল। এর কারণগুলি হল-

আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা: ভারতের সমগ্র অঞ্চলের সিপাহি ও জনগণ এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেনি। উত্তর-পশ্চিম ভারত, পূর্ব ভারত এবং দক্ষিণ ভারতের একাংশ এই বিদ্রোহ থেকে দূরে ছিল। শিখ ও গোর্খা সৈন্যরা বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের সাহায্য করেছিল।

যোগ্য নেতৃত্বের অভাব : সেনাপতি লরেন্স, ক্যাম্পবেল, নিকলসন প্রমুখ ইংরেজ সেনাপতিগণ নানাসাহেব, তাঁতিয়া টোপি, লক্ষ্মীবাঈয়ের তুলনায় যুদ্ধ বিষয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও পারদর্শী ছিলেন।

পরিকল্পনার অভাব : বিদ্রোহীদের মধ্যে কোনো সর্বভারতীয় পরিকল্পনা ছিল না। বিদ্রোহীরা মূলত আঞ্চলিক ও ব্যক্তিগত
স্বার্থের দ্বারা পরিচালিত হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে যুদ্ধ শুরু করেন।

জাতীয়তা বোধের অভাব : বিদ্রোহীরা জাতীয় স্বার্থে কোনো স্থির লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন করেননি।

দেশীয় রাজাদের অসহযোগিতা : গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, হায়দ্রাবাদের নিজাম, নেপালের জঙ্গ বাহাদুর, কাশ্মীর ও যোধপুরের রাজারা বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের সাহায্য করেন।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অসহযোগিতা : পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় সমাজে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে ইংরেজদের
বিরোধিতা করেননি।

আধুনিক অস্ত্রের অভাব : আধুনিক ও উন্নত অস্ত্রের অভাবে বিদ্রোহীরা সহজেই ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়।

নৌশক্তির অভাব : উন্নত ও শক্তিশালী নৌশক্তি ইংরেজদের সাফল্যকে ত্বরান্বিত করেছিল।

উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা : রেললাইন, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ ইত্যাদি আধুনিক উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ইংরেজদের যুক্ত সংবাদ ও সৈন্য প্রেরণের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল।ভারতীয় সেনাবাহিনী এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকায় তারা সমস্যার সম্মুখীন হয়।

বিশ্বাসঘাতকতা : মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের কিছু কর্মচারী ও সেনাপতির বিশ্বাসঘাতকতা বিদ্রোহীদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মহাবিদ্রোহের ফলাফল:

কোম্পানির শাসনের অবসান :

1.বিদ্রোহের ব্যাপকতা লক্ষ করে ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ভারতের প্রশাসনিক দায়িত্ব রাখা যুক্তিসংগত নয় বলে বিবেচনা করে।

2. 1858 খ্রিস্টাব্দের 2 আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ভারতশাসন আইন’ পাস করার মাধ্যমে ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটানো হয়।

3. ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ সরকার বা ইংল্যান্ডের মহারানি ভিক্টোরিয়ার হাতে অর্পণ করা হয়।

4. ভারতের গভর্নর জেনারেল ‘ভাইসরয়’ বা রাজপ্রতিনিধিরূপে ভারতের শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন।

মহারানীর ঘোষণাপত্র :

● 1858 খ্রিস্টাব্দের 1 নভেম্বর মহারানির ঘোষণাপত্র দ্বারা ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি নীতি ও আদর্শের কথা ঘোষণা করা হয়।
● স্বত্ববিলোপ নীতি পরিত্যক্ত হয় এবং দেশীয় রাজ্যগুলিকে দত্তকপুত্র গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়।
● দেশীয় রাজ্যের সঙ্গে ইংরেজদের সম্পাদিত চুক্তিগুলি মেনে চলার কথা বলা হয়।
● জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল যোগ্য ভারতীয়দের সরকারি চাকরি প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়।
● সরকার ভারতীয়দের সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানানো হয়।
● স্থির হয় ব্রিটিশ সরকার এরপর থেকে ভারতে আর সাম্রাজ্যবিস্তারে আগ্রহ দেখাবে না।
● একই সাথে গভর্নর জেনারেল বা ভাইসরয় দেশীয় রাজ্যগুলির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি করবে বলে নির্ধারিত হয়।

শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন : 1858 খ্রিস্টাব্দের ‘Act for better Government of India’ অনুসারে ভারতে শাসনকার্য পরিচালনার সকল দায়িত্ব রানির প্রতিনিধি হিসেবে ভারতসচিবের উপর অর্পিত হয়।স্থির হয় যে, 15 জন সদস্য নিয়ে গঠিত India Council ভারতসচিবের কাজে সহায়তা করবে।

আইন পরিষদে ভারতীয়দের নিয়োগ :
1858 খ্রিস্টাব্দের আইনে শাসনকার্যে ভারতীয়দের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। 1861 খ্রিস্টাব্দে নতুন ‘ভারতশাসন আইন’ দ্বারা কেন্দ্রীয় আইন পরিষদ এবং কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই আইন পরিষদে ভারতীয় সদস্যদের গ্রহণের ব্যবস্থা গৃহীত হয়। স্যার দিনকর রাও, পাতিয়ালা ও বেনারসের রাজা বেসরকারি সদস্য হিসেবে আইনসভায় স্থান
লাভ করেন।

সামরিক পরিবর্তন : ব্রিটিশ বিরোধী সম্ভাব্য সেনা অভ্যুত্থান দূর করার লক্ষ্যে সামরিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন করা
➛ সেনাবাহিনীতে শ্বেতাঙ্গ সৈন্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়।
➛ গোলন্দাজ বাহিনী সম্পূর্ণভাবে ইংরেজদের হাতে রাখা হয়।
➛ সীমান্তরক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ইংরেজ সেনাদের উপর অর্পিত হয়।
➛ সামরিক উচ্চপদে ভারতীয়দের নিয়োগ না করার নীতি গৃহীত হয়।
➛ যে সমস্ত সৈন্য মহাবিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল, সরকার তাদের ‘অসামরিক জাতি’ আখ্যা দেয় এবং তাদের ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবিভাগে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
➛ ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে যাতে ঐক্য গড়ে উঠতে না পারে, সেজন্য ভারতীয় বাহিনীর প্রতিটি বিভাগে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের সেনা নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।

মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান :

বিদ্রোহের পর মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়।
বাহাদুর শাহের পুত্র ও পৌত্রদের ব্রিটিশ সরকার হত্যা করলে মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।

নবযুগের সূচনা :

● মহাবিদ্রোহের পর ভারতবর্ষে প্রকৃত অর্থে মধ্যযুগের অবসান ও আধুনিক যুগের সূচনা হয়।
● ইংরেজরা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদ তৈরিতে সচেষ্ট হলেও পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়।
● ভারতবাসীর মধ্যে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি আদর্শের বিকাশ ঘটে।

Welcome Visitor

Rlearn Education
error: Content is protected !!